রূপলাল হাউস ভ্রমণ গাইড 2026 | খরচ ও যাওয়ার উপায়
রূপলাল হাউজ় (Ruplal House) পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত উনিশ শতকের আভিজাত্য, স্থাপত্যশৈলী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মহিমান্বিত প্র...
Ruplal House (রূপলাল হাউস)
রূপলাল হাউজ় (Ruplal House) পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত উনিশ শতকের আভিজাত্য, স্থাপত্যশৈলী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মহিমান্বিত প্রতীক। ঢাকার শ্যামবাজার ও ফরাশগঞ্জের মোহনায় প্রায় ৯১ মিটার দীর্ঘ এলাকাজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই দোতলা সুরম্য রাজপ্রাসাদটি তৎকালীন ঢাকার অন্যতম প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যাংকার ভ্রাতৃদ্বয় রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাসের অমর কীর্তি। গ্রিক-রোমান নিও-ক্লাসিক্যাল (Neoclassical) নির্মাণশৈলী, সুউচ্চ করিন্থিয়ান স্তম্ভ, বিশাল নৃত্যকক্ষ (বলরুম) এবং নদীতীরবর্তী বিস্তৃত আঙিনা সম্বলিত এই প্রাসাদটি তৎকালীন সময়ে ঢাকার নবাবদের আহসান মঞ্জিলের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হতো। ১৮৮৮ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে এখানে আয়োজিত এক রাজকীয় বল ড্যান্সের (Ball Dance) স্মৃতি আজও ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল। ⏱️ ভ্রমণের সময় ১-২ ঘণ্টা (হাফ ডে) 💰 জনপ্রতি বাজেট ২০০ - ৫০০ টাকা 🌤️ সেরা সময় অক্টোবর - মার্চ 🏡 ধরণ / ক্যাটাগরি ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ ও ঐতিহ্য 🚶 কঠিনতার মাত্রা সহজ (ঐতিহাসিক হাঁটা পথ) 👨👩👧👦 উপযুক্ত ভ্রমণকারী ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও স্থপতি 🌟 প্রধান আকর্ষণ করিন্থিয়ান ক্যাপিটাল ও নদীমুখী প্রাসাদ 📶 নেটওয়ার্ক কভারেজ সব সিমের 4G/5G সংযোগ ১. রূপলাল হাউজ় এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য রূপলাল হাউজের আদি ইতিহাস জড়িয়ে আছে ঢাকার একদা শক্তিমান আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের সাথে। আনুমানিক ১৮২৫ সালের দিকে তৎকালীন এক ধনাঢ্য আর্মেনীয় জমিদার আরাতুন এই স্থানে একটি একতলা বাসভবন নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে ১৮৩৫ সালে ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার স্বরূপ চন্দ্র দাস এটি কিনে নেন। স্বরূপ চন্দ্র দাসের দুই সুযোগ্য পুত্র রূপলাল দাস এবং রঘুনাথ দাস ছিলেন উনিশ শতকের ঢাকার অন্যতম শীর্ষ ধনী ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব। ১৮৪০-এর দশকে কলকাতার বিখ্যাত আর্কিটেকচারাল ফার্ম 'মার্টিন বার্ন' (Martin Burn)-এর এক ব্রিটিশ স্থপতির নকশায় পুরাতন ভবনটিকে পুনর্নির্মাণ করে গ্রিক-রোমান নিও-ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যের এক অনন্য রাজপ্রাসাদে রূপ দেন রূপলাল দাস। প্রাসাদটি মূলত দুটি সুষম ব্লকে বিভক্ত ছিল—পশ্চিম অংশটি ছিল রূপলাল দাসের এবং পূর্ব অংশটি ছিল রঘুনাথ দাসের। রূপলাল দাস ছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। তাঁর আমন্ত্রণে ভারতবর্ষের বহু প্রখ্যাত ওস্তাদ ও বাইজি এখানে সংগীত পরিবেশন করতেন। ১৮৮৮ সালের ২৯ নভেম্বর ভারতের বড়লাট (ভাইসরয়) লর্ড ডাফরিন ও তাঁর পত্নী লেডি ডাফরিন ঢাকা সফরে এলে তাঁদের সম্মানে রূপলাল হাউজে এক অবিস্মরণীয় বৈকালিক চা-চক্র ও বল ড্যান্সের আয়োজন করা হয়। ডাফরিনের এই সফরকে কেন্দ্র করে নবাব আহসানউল্লাহর আহসান মঞ্জিল ও রূপলাল হাউজের মধ্যে এক রাজকীয় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে রূপলাল হাউজের বলরুম ও আলোকসজ্জা ব্রিটিশ অতিথিদের ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর দাস পরিবার কলকাতায় স্থানান্তরিত হলে প্রাসাদটির মালিকানা হাতবদল হয় এবং পরবর্তীতে এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হলেও বর্তমানে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত। ২. রূপলাল হাউজ় কোথায় অবস্থিত রূপলাল হাউজ রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার সূত্রাপুর থানাধীন ফরাশগঞ্জ ও শ্যামবাজার এলাকায় অবস্থিত। সুনির্দিষ্টভাবে এটি বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরবর্তী বাকল্যান্ড বাঁধের ঢাল ঘেঁষে এবং ৯ নম্বর রূপলাল দাস লেনে অবস্থিত। এর পশ্চিমে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও ওয়াইজঘাট লালকুঠি এবং পূর্বে ফরাশগঞ্জ ক্লাব ও পোস্তগোলা অবস্থিত। ৩. রূপলাল হাউজ় কেন ভ্রমণ করবেন (প্রধান আকর্ষণসমূহ) নিও-ক্লাসিক্যাল ও গ্রিক স্থাপত্যশৈলী: প্রাসাদের সম্মুখভাগ ও নদীমুখী অংশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার করিন্থিয়ান ও ডরিক স্তম্ভ, ফুল ও পাতার অলংকরণযুক্ত ক্যাপিটাল এবং সুউচ্চ আর্চ সমসাময়িক ইউরোপীয় রাজপ্রাসাদের নিখুঁত অনুভূতি দেয়। ঐতিহাসিক বলরুম ও নাচঘর: রূপলাল হাউজের দোতলায় অবস্থিত সুরম্য বলরুমটি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে অভিজাত নাচঘর। এখানকার মেঝে কাঠের তক্তা এবং বেলজিয়াম কাঁচের বিশাল আয়না ও চোখ ধাঁধানো ঝাড়বাতি দিয়ে সজ্জিত ছিল। নদীমুখী স্থাপত্য ও বাকল্যান্ড বাঁধের ইতিহাস: একসময় রূপলাল হাউজের কোল ঘেঁষে বুড়িগঙ্গায় নৌকা ও রাজকীয় বজরা ভিড়ত। বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকার অভিজাত ব্যক্তিদের নদীমুখী জীবনযাত্রার এটি এক জীবন্ত দলিল। লর্ড ডাফরিন বল ড্যান্সের স্মৃতি: ব্রিটিশ ভারতের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ও ঢাকার অভিজাত সমাজের ঐতিহাসিক মিলনের এই পটভূমিটি ইতিহাসপ্রেমীদের স্মৃতিমেদুর করে তোলে। পুরান ঢাকার মশলা ও পাইকারি আড়তের আবহ: শ্যামবাজারের ঐতিহ্যবাহী আড়ত ও ফরাশগঞ্জের প্রাচীন কাঠের বাড়িগুলোর মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুরান ঢাকার এক ভিন্নমাত্রিক স্পন্দন অনুভব করা যায়। ৪. কীভাবে যাবেন (ঢাকা ও দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বিস্তারিত যাতায়াত রুট) ১ম ধাপ: ঢাকা শহরের মূল পয়েন্ট থেকে যাতায়াত: 🚌 ১. ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিটি বাসে: মিরপুর, উত্তরা, ফার্মগেট বা শাহবাগ থেকে সদরঘাট অথবা দয়াগঞ্জগামী বাসে উঠে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাহাদুর শাহ পার্ক বা সদরঘাট টার্মিনালে নামতে হবে। জনপ্রিয় সিটি বাস: তানজিল পরিবহন, ভিক্টর ক্ল্যাসিক, আজমেরী গ্লোরি, বিহঙ্গ পরিবহন। ভাড়া: রুটভেদে ৩৫ থেকে ৬০ টাকা। গন্তব্য স্টপ: বাহাদুর শাহ পার্ক (ভিক্টোরিয়া পার্ক) অথবা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল মোড়। 🚆 ২. মেট্রোরেল ও ট্রেন সংযোগ: উত্তরা বা মিরপুর থেকে এমআরটি লাইন-৬ (মেট্রোরেল)-এ চড়ে সরাসরি মতিঝিল স্টেশনে নেমে রিকশা বা সিএনজিতে মাত্র ১৫-২০ মিনিটে শ্যামবাজার রূপলাল হাউজে পৌঁছানো সম্ভব। প্রারম্ভিক পয়েন্ট যানবাহন কানেক্টিং রুট আনুমানিক সময় মতিঝিল মেট্রো স্টেশন রিকশা / সিএনজি রায়সাহেব বাজার হয়ে শ্যামবাজার ১৫ - ২০ মিনিট কমলাপুর রেল স্টেশন রিকশা / সিএনজি ইত্তেফাক মোড় - দয়াগঞ্জ হয়ে ফরাশগঞ্জ ২০ - ২৫ মিনিট 🚢 ৩. নৌপথ সংযোগ (লঞ্চ ও খেয়ানৌকা): দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে লঞ্চে সদরঘাটে নেমে পূর্বদিকে মাত্র ৭-৮ মিনিট নদীর বাঁধ সড়ক ধরে হাঁটলেই শ্যামবাজার রূপলাল হাউজের পেছনের অংশে পৌঁছানো যায়। এছাড়া কেরানীগঞ্জ বা জিঞ্জিরা থেকে খেয়ানৌকায় সরাসরি শ্যামবাজার ঘাটে নেমে চোখের সামনেই রূপলাল হাউজ দেখা যায়। ২য় ধাপ: বাহাদুর শাহ পার্ক বা সদরঘাট থেকে রূপলাল হাউজ: বাহাদুর শাহ পার্ক বা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মোড় থেকে রূপলাল হাউজের দূরত্ব মাত্র ৮০০ মিটার। পায়ে হেঁটে: বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে বাংলাবাজার মোড় হয়ে ফরাশগঞ্জের দিকে হেঁটে অথবা সদরঘাট টার্মিনালের পূর্ব পাশের বাঁধ সড়ক ধরে শ্যামবাজার প্রবেশ করলেই রূপলাল হাউজের বিশাল স্তম্ভগুলো চোখে পড়বে (সময় লাগে মাত্র ৭-১০ মিনিট)। রিকশাযোগে: পার্ক বা সদরঘাট থেকে রিকশায় রূপলাল হাউজের সামনে যেতে ভাড়া নেয় ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ৫. ভ্রমণের সময়সীমা (Duration) রূপলাল হাউজের মূল সম্মুখভাগ, নদীমুখী স্তম্ভ ও পারিপার্শ্বিক স্থাপত্য ঘুরে দেখতে ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগে। পুরান ঢাকার অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের (যেমন: লালকুঠি, আহসান মঞ্জিল, শাঁখারীবাজার) সাথে সমন্বয় করে এটি মূলত একটি চমৎকার হাফ-ডে বা ১ দিনের হেরিটেজ ট্যুর হিসেবে ভ্রমণ করা সবচেয়ে উপযোগী। ৬. বাজেট টেবিল (Estimated Budget per Person) খাত বিবরণ আনুমানিক খরচ (টাকা) যাতায়াত (ঢাকা শহরের ভেতর) সিটি বাস / মেট্রোরেল ও রিকশা ভাড়া ১০০ - ২৫০ প্রবেশ ফি কোনো প্রবেশ ফি নেই (উন্মুক্ত বহিরাঙ্গন) ০ পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার কাচ্চি বিরিয়ানি, বিউটি লাচ্ছি ও মিষ্টি ২০০ - ৪০০ নৌভ্রমণ (ঐচ্ছিক) বুড়িগঙ্গা নদীতে খেয়ানৌকায় রূপলাল হাউজের রিভারভিউ দর্শন ৫০ - ১০০ বিবিধ ও চা-পানি মিনারেল ওয়াটার ও জলখাবার ৫০ সর্বমোট আনুমানিক বাজেট ৳ ৪০০ - ৮০০ টাকা ৭. গাইড ও নিরাপত্তা অনুমতি রূপলাল হাউজ বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন হলেও এর নিচতলা ও আশেপাশের আঙিনা শ্যামবাজারের কাঁচামাল ও মশলার আড়ত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভবনটির বাইরের স্থাপত্য ও নদীমুখী অংশ দেখার জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না। তবে ভেতরের জরাজীর্ণ কক্ষ বা ছাদে প্রবেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় এবং স্থানীয়দের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ বজায় রাখা শ্রেয়। ৮. কোথায় থাকবেন (Accommodation Options) ঢাকার বাইরের পর্যটকদের জন্য রূপলাল হাউজ ভ্রমণের পর রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে নিকটস্থ ভালো বিকল্পগুলো হলো: সদরঘাট ও বাবুবাজার এলাকা: লঞ্চ টার্মিনালের সন্নিকটে সাধারণ মানের বেশ কিছু বাজেট হোটেল রয়েছে (ভাড়া: ৫০০ থেকে ১,২০০ টাকা)। মতিঝিল ও পল্টন (দূরত্ব ২-৩ কিমি): নিরাপদ ও পারিবারিক পরিবেশের জন্য মতিঝিলের হোটেল এশিয়া, হোটেল অরনেট এবং দৈনিক বাংলা মোড়ের ফার্স হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস অত্যন্ত উপযোগী (ভাড়া: ১,৫০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা)। ৯. কী খাবেন (Local Food Delicacies) শ্যামবাজার ও ফরাশগঞ্জের মালাই চা: শ্যামবাজার ঘাটের কাছে মাটির কাপে ঘন দুধের সুস্বাদু মালাই চা অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিউটি লাচ্ছি ও ফালুদা: লালকুঠি ও জনসন রোডের শতবর্ষী বিউটি লাচ্ছির স্পেশাল লেমনেড, লাচ্ছি ও ফালুদা এক স্বর্গীয় তৃপ্তি দেয়। পুরান ঢাকার শাহি কাচ্চি ও তেহারী: নাজিরাবাজারের হানিফ বিরিয়ানি কিংবা রায়সাহেব বাজারের ঐতিহ্যবাহী কাচ্চি বিরিয়ানি ও ঝাল বোরহানি। খাঁটি বাকরখানি: রূপলাল দাস লেনের আশেপাশের তন্দুর থেকে গরম ও মচমচে নোনতা ও পনিরের বাকরখানি সংগ্রহ করতে পারেন। ১০. কী কী সঙ্গে নেবেন (Travel Packing Checklist) শ্যামবাজারের ব্যস্ত ও কিছুটা স্যাঁতসেঁতে গলিতে হাঁটার জন্য সুবিধাজনক জুতো বা কেডস। গ্রিক স্তম্ভ ও নিও-ক্লাসিক্যাল আর্চের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা ও পাওয়ার ব্যাংক। মশলা বাজারের তীব্র ঝাঁজ ও ধুলোবালি থেকে সুরক্ষার জন্য ফেস মাস্ক। ব্যক্তিগত পানির বোতল ও সানগ্লাস। ১১. কঠিনতার মাত্রা ও নিরাপত্তা সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ও আচরণবিধি: শ্যামবাজার দেশের অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি কাঁচাবাজার ও মশলার আড়ৎ; তাই সকালের দিকে এখানে কুলিদের ব্যস্ততা ও মালবাহী ভ্যানের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। সাবধানে চলাফেরা করুন। রূপলাল হাউজের ওপরের তলার অনেক কাঠামোগত অংশ ও কাঠের পাটাতন শতবর্ষী ও অত্যন্ত জরাজীর্ণ; কর্তৃপক্ষের সতর্কতা ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ছাদ বা নড়বড়ে সিঁড়িতে উঠবেন না। ব্যস্ত বাজারে পকেটমার থেকে সাবধান থাকুন এবং মোবাইল ও মানিব্যাগ নিরাপদে রাখুন। নদীর দিক থেকে রূপলাল হাউজের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখতে বুড়িগঙ্গায় নৌকা ভাড়া করার সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার নিশ্চিত করুন। ১২. রূপলাল হাউজ় ভ্রমণের সেরা সময় (Best Time to Visit) রূপলাল হাউজ পরিদর্শনের সেরা সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ মাস (শীত ও বসন্তকাল)। বিশেষ করে শুক্রবার সকাল ০৭:৩০ থেকে সকাল ১০:০০ টার মধ্যে ভ্রমণ করা সবচেয়ে আরামদায়ক। ছুটির দিন সকালে শ্যামবাজারের পাইকারি লোড-আনলোডের চাপ তুলনামূলক কম থাকে, ফলে উন্মুক্ত আলোয় ভবনের অসাধারণ গ্রিক স্থাপত্য ও করিন্থিয়ান স্তম্ভগুলোর ছবি স্পষ্টভাবে ফ্রেমবন্দি করা যায়। ১৩. সম্পূর্ণ ভ্রমণ পরিকল্পনা (পারফেক্ট ইটিনারেরি) সকাল ০৮:০০ - সকাল ০৮:৩০: পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে আগমন এবং স্থানীয় ক্যাফেতে ঐতিহ্যবাহী গরম বাকরখানি ও চা দিয়ে সকালের নাস্তা সম্পন্ন। সকাল ০৮:৩০ - সকাল ০৯:৩০: ফরাশগঞ্জের রূপলাল দাস লেন ধরে ঐতিহাসিক রূপলাল হাউজে প্রবেশ; নিও-ক্লাসিক্যাল করিন্থিয়ান পিলার, সুউচ্চ আর্চ ও লর্ড ডাফরিন বলরুমের স্থাপত্য অবলোকন। সকাল ০৯:৩০ - সকাল ১০:১৫: শ্যামবাজার ঘাট থেকে খেয়ানৌকায় বুড়িগঙ্গার বুকে নেমে নদী থেকে রূপলাল হাউজের সুদীর্ঘ ৯১ মিটার জমকালো নদীমুখী রূপের ছবি তোলা। সকাল ১০:১৫ - সকাল ১১:৪৫: রূপলাল হাউজ থেকে মাত্র ৫ মিনিট হেঁটে ওয়াইজঘাটের ঐতিহাসিক লালকুঠি (নর্থব্রুক হল) ও লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ পরিদর্শন। সকাল ১১:৪৫ - দুপুর ০১:৩০: লালকুঠির কাছেই অবস্থিত ঢাকার নবাবদের অপরূপ প্রাসাদ আহসান মঞ্জিল জাদুঘর বিস্তারিত ঘুরে দেখা। দুপুর ০১:৩০ - দুপুর ০২:৩০: নাজিরাবাজার বা রায়সাহেব বাজারে গিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি ও বিউটি লাচ্ছির ফালুদা দিয়ে তৃপ্তিদায়ক আহারের মাধ্যমে স্মৃতিময় পুরান ঢাকা ট্যুর সম্পন্ন। ১৪. আশেপাশের দর্শনীয় স্থান (Nearby Tourist Spots) লালকুঠি (নর্থব্রুক হল): ওয়াইজঘাটে অবস্থিত ব্রিটিশ আমলের লাল ইটের ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্য ও রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত টাউন হল। আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত ঢাকার নবাবদের সুরম্য ঐতিহাসিক প্রাসাদ ও বর্তমান জাতীয় জাদুঘর। বাহাদুর শাহ পার্ক: ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক মহাবিদ্রোহের শহিদদের স্মৃতিবিজড়িত পার্ক। শাঁখারীবাজার: ঢাকার তিনশত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শাঁখা শিল্পীদের কর্মচঞ্চল বসতি ও মন্দির। ফরাশগঞ্জ ফ্রেঞ্চ কলোনির স্মৃতিচিহ্ন: ফরাসি বণিকদের ঐতিহাসিক বাণিজ্যের স্মৃতিধন্য প্রাচীন ভবনসমূহ। ১৫. রূপলাল হাউজ় সম্পর্কে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ) প্রশ্ন ১: রূপলাল হাউজ কে এবং কখন নির্মাণ করেছিলেন? উত্তর: এটি মূলত ১৮২৫ সালে আর্মেনীয় ব্যবসায়ী আরাতুনের একতলা বাড়ি ছিল। পরবর্তীতে ১৮৪০-এর দশকে ঢাকার বিখ্যাত ব্যাংকার রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস কলকাতার মার্টিন বার্ন ফার্মের ব্রিটিশ স্থপতির মাধ্যমে একে বিশালাকার নিও-ক্লাসিক্যাল প্রাসাদে রূপান্তর করেন। প্রশ্ন ২: এখানে কি কোনো প্রবেশ টিকিট লাগে? উত্তর: না, রূপলাল হাউজ দেখার জন্য কোনো প্রকার টিকিট বা প্রবেশ ফি দিতে হয় না। প্রশ্ন ৩: রূপলাল হাউজের বলরুম কেন বিখ্যাত ছিল? উত্তর: ১৮৮৮ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের ঢাকা আগমন উপলক্ষে এই বলরুমে এক জমকালো বল ড্যান্সের আয়োজন করা হয়েছিল। বেলজিয়াম কাঁচ ও ঝাড়বাতি দিয়ে সজ্জিত এই নাচঘরের আভিজাত্য তৎকালীন অবিভক্ত ভারতে বিপুল প্রশংসিত হয়েছিল। প্রশ্ন ৪: ভবনটির সেরা ভিউ কোথা থেকে সবচেয়ে সুন্দর দেখা যায়? উত্তর: শ্যামবাজার ঘাট থেকে খেয়ানৌকা নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর থেকে তাকালে রূপলাল হাউজের দীর্ঘ নদীমুখী করিন্থিয়ান স্তম্ভ ও রাজকীয় সম্মুখভাগ সবচেয়ে চমৎকারভাবে উপভোগ করা যায়। প্রশ্ন ৫: রূপলাল হাউজের বর্তমান অবস্থা কেমন? উত্তর: ভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে এর চত্বর ও নিচতলা শ্যামবাজারের পাইকারি কাঁচামাল ও মশলার গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার ফলে এর দ্রুত সংস্কার ও সার্বিক সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
ভ্রমণের সেরা সময়
রূপলাল হাউজ পরিদর্শনের সেরা সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ মাস (শীত ও বসন্তকাল)। বিশেষ করে শুক্রবার সকাল ০৭:৩০ থেকে সকাল ১০:০০ টার মধ্যে ভ্রমণ করা সবচেয়ে আরামদায়ক।