তারা মসজিদ ভ্রমণ গাইড 2026 | খরচ ও যাওয়ার উপায়
তারা মসজিদ (Star Mosque / Sitara Masjid) পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত অষ্টাদশ শতাব্দীর এক বিখ্যাত ও নয়নাভিরাম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।...
Star Mosque (Tara Masjid) (তারা মসজিদ)
তারা মসজিদ (Star Mosque / Sitara Masjid) পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত অষ্টাদশ শতাব্দীর এক বিখ্যাত ও নয়নাভিরাম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। সাদা মার্বেল পাথর এবং অসংখ্য নীল রঙের তারার নকশায় অলংকৃত এই প্রাচীন মসজিদটি তার অনন্য ‘চিনিতুকড়ি’ (China ceramics) মোজাইক কারুকাজের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। মোঘল ও আধুনিক স্থাপত্যকলার মেলবন্ধনে নির্মিত এই তারা মসজিদ ঢাকার অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও পর্যটন আকর্ষণ। ১. ইতিহাস ও ঐতিহ্য অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে (প্রায় ১৭০৬-১৭২৪ খ্রিষ্টাব্দের দিকে) ঢাকার জমিদার মির্জা গোলাম পীর (মির্জা আহমেদ জান) এই মসজিদটি মূল ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট মোঘল রীতিতে নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে পুরান ঢাকার ধনী ব্যবসায়ী আলী জান বেপারী মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার করেন এবং এতে সুদূর জাপান ও ব্রিটেন থেকে আনা রঙিন সিরামিকসের থালা-বাসন ও টাইলসের টুকরো (চিনিতুকড়ি শিল্প) দিয়ে উজ্জ্বল তারা ও ফুলের অপূর্ব নকশা সংযোজন করেন। ১৯৮৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এটি ৫ গম্বুজে রূপান্তরিত হয়। ২. কোথায় অবস্থিত মসজিদটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পুরান ঢাকার আরমানিটোলা রোডে (আবুল হাসনাত রোড সংলগ্ন) অবস্থিত। এটি বাবুবাজার ব্রিজ থেকে মাত্র ৫০০ মিটার এবং বিখ্যাত আরমেনিয়ান চার্চের কাছাকাছি অবস্থিত। ৩. কেন ভ্রমণ করবেন অনন্য চিনিতুকড়ি মোজাইক আর্ট: রঙিন সিরামিক ও চীনামাটির টুকরো দিয়ে দেয়াল ও গম্বুজে ফুটিয়ে তোলা নীল তারা এবং জাপানি ফুজি পাহাড়ের দৃশ্য। পাঁচ গম্বুজের চমৎকার কাঠামো: সাদা ধবধবে মার্বেল পাথরের ওপর সুদৃশ্য গম্বুজ ও সুউচ্চ মিনারের সমারোহ। ঐতিহাসিক পুরান ঢাকা অভিজ্ঞতা: একই সাথে পুরান ঢাকার শতবর্ষী সংস্কৃতি, খাবার ও স্থাপত্য ঐতিহ্য উপভোগ। সহজ যাতায়াত: ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে খুব সহজেই রিকশা বা গণপরিবহনে পৌঁছানো যায়। ৪. কীভাবে যাবেন ধাপ ১: ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্তান / গুলিস্তান মেট্রো / বাবুবাজার মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি বা মতিঝিল থেকে গুলিস্তান বা বাবুবাজারগামী যেকোনো বাস বা সিএনজি কিংবা মেট্রোরেলে চড়ে মতিঝিল/ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে নামা যায়। ধাপ ২: গুলিস্তান বা বাবুবাজার থেকে আরমানিটোলা তারা মসজিদ গুলিস্তান ফুলবাড়িয়া, তাঁতীবাজার বা বাবুবাজার ব্রিজ মোড় থেকে ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার রিকশায় চড়ে সরাসরি আরমানিটোলা তারা মসজিদে আসা যায় (রিকশা ভাড়া ৪০ - ৮০ টাকা)। ৫. ভ্রমণের সময়সীমা তারা মসজিদ ও এর আঙিনা ভালোভাবে ঘুরে দেখতে, কারুকাজ দেখতে এবং ছবি তুলতে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় যথেষ্ট। এর সাথে পুরান ঢাকার অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান যুক্ত করে পুরো একদিনের ট্যুর দেওয়া যায়। ৬. সম্ভাব্য খরচ ও বাজেট খাত বিবরণ আনুমানিক খরচ (জনপ্রতি) যাতায়াত (ঢাকা শহর থেকে আসা-যাওয়া) বাস / মেট্রোরেল ও রিকশা ভাড়া ৳১০০ - ৳২০০ খাবার (পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার) বিরিয়ানি, কাবাব ও মাঠা/লাবং ৳২০০ - ৳৪০০ এন্ট্রি ফি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রবেশযোগ্য ৳০ সর্বমোট সম্ভাব্য বাজেট ৳৩০০ - ৳৬০০ ৭. গাইড ও নিরাপত্তা অনুমতি তারা মসজিদ ভ্রমণের জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন হয় না। এখানে পর্যটকদের সহায়তার জন্য খাদেম ও স্থানীয়রা থাকেন। কোনো গাইড ফি ছাড়াই মসজিদটি স্বাচ্ছন্দে পরিদর্শন করা যায়। ৮. কোথায় থাকবেন যেহেতু এটি ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত, তাই আলাদাভাবে আবাসিক হোটেলে থাকার প্রয়োজন নেই। দূরের জেলা থেকে আসা পর্যটকরা মতিঝিল, গুলিস্তান বা সদরঘাট সংলগ্ন বাজেট আবাসিক হোটেল কিংবা ধানমন্ডি/উত্তরা এলাকার মানসম্মত হোটেলে থাকতে পারেন। ৯. কী খাবেন তারা মসজিদ দর্শনের পাশাপাশি পুরান ঢাকার সুস্বাদু সব খাবারের স্বাদ নেওয়া জরুরি। কাছেই নাজিরাবাজার বা চকবাজারে পাবেন বিখ্যাত হাজী বিরিয়ানি, নান্না বিরিয়ানি, বিউটি বোবা ও মাঠা, বিউটি লস্যি এবং সুতি কাবাব ও বাকরখানি। ১০. কী কী সঙ্গে নেবেন পবিত্র স্থানের উপযোগী মার্জিত ও শালীন পোশাক। মহিলাদের জন্য মাথা ঢেকে রাখার স্কার্ফ বা ওড়না। ক্যামেরা বা মোবাইল ফোন (নামাজের সময় ব্যতীত ছবি তোলার জন্য)। জুতা রাখার জন্য ছোট পলিব্যাগ (ঐচ্ছিক)। ১১. কঠিনতার মাত্রা ও নিরাপত্তা সতর্কতা মসজিদ পরিদর্শনের নিরাপত্তা ও শিষ্টাচার: নামাজের সময় খেয়াল রাখুন: ৫ ওয়াক্ত নামাজের সময় পর্যটন ও ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন। যোহরের পর থেকে আছরের মধ্যবর্তী সময় দর্শনের জন্য আদর্শ। শালীনতা রক্ষা করুন: জুতা খুলে প্রবেশ করুন এবং মসজিদের পবিত্রতা বজায় রাখুন। পকেটমার ও ভিড় থেকে সতর্ক থাকুন: পুরান ঢাকার সরু গলিতে চলাচলের সময় নিজ নিজ মোবাইল ও মানিব্যাগ সাবধানে রাখুন। ১২. ভ্রমণের সেরা সময় সারা বছরই তারা মসজিদ ভ্রমণ করা যায়। তবে শীতকালে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) পুরান ঢাকার সরু গলি হেঁটে ঘুরে দেখা বেশ আরামদায়ক হয়। ১৩. সম্পূর্ণ ভ্রমণ পরিকল্পনা (পুরান ঢাকা ১ দিনের ইটিনারারি) সকাল ০৯:৩০ AM: পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের মাধ্যমে দিন শুরু। সকাল ১১:৩০ AM: রিকশায় আরমানিটোলা এসে তারা মসজিদ ও কাছেই শতবর্ষী আরমেনিয়ান চার্চ ঘুরে দেখা। দুপুর ০১:৩০ PM: নাজিরাবাজারে হাজীর বিরিয়ানি বা নান্নার বিরিয়ানি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ। বিকাল ০৩:০০ PM: আহসান মঞ্জিল রাজবাড়ি ও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে রূপলাল হাউস দেখা। বিকাল ০৫:০০ PM: বিউটি লস্যির বিখ্যাত মাঠা ও লস্যি পান করে দিনের সমাপ্তি। ১৪. আশেপাশের দর্শনীয় স্থান আরমেনিয়ান চার্চ: তারা মসজিদের পাশেই অবস্থিত ১৭৮১ সালের শতবর্ষী খ্রিষ্টান গির্জা। আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত বিখ্যাত গোলাপি প্রাসাদ বা নবাবদের রাজবাড়ি। লালবাগ কেল্লা: সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা আযম কর্তৃক নির্মিত ১৭ শতকের দুর্গ। নাজিরাবাজার: পুরান ঢাকার বিশ্বখ্যাত ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমাহার। ১৫. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ) প্রশ্ন: তারা মসজিদ কোথায় অবস্থিত? উত্তর: তারা মসজিদ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকায় অবস্থিত। প্রশ্ন: তারা মসজিদে প্রবেশের জন্য কি কোনো ফি দিতে হয়? উত্তর: না, তারা মসজিদে প্রবেশের জন্য কোনো ফি বা টিকেট প্রয়োজন হয় না। প্রশ্ন: তারা মসজিদের বিশেষত্ব কী? উত্তর: সাদা মার্বেল পাথরের ওপর সুদূর জাপান ও ব্রিটেন থেকে আনা ছোট ছোট সিরামিক টাইলসের টুকরো দিয়ে তারা ও ফুল আঁকা 'চিনিতুকড়ি' অলংকরণ এই মসজিদের মূল বিশেষত্ব। প্রশ্ন: অমুসলিম ও বিদেশি পর্যটকরা কি তারা মসজিদ ঘুরে দেখতে পারেন? উত্তর: হ্যাঁ, নামাজের সময় ব্যতীত অন্যান্য সময়ে শালীন পোশাক পরিধান করে পর্যটকরা তারা মসজিদের চত্বর ও স্থাপত্য ঘুরে দেখতে পারেন।
ভ্রমণের সেরা সময়
দিনের বেলা