হোসেনী দালান ভ্রমণ গাইড 2026 | খরচ ও যাওয়ার উপায়

হোসেনী দালান (Hussaini Dalan / Imambara) পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অবস্থিত সপ্তদশ শতাব্দীর এক সুপরিচিত ঐতিহাসিক ও পবিত্র শিয়া ইমামবাড়া। ১৬৪২...

Hossaini Dalan (হোসেনী দালান)

হোসেনী দালান (Hussaini Dalan / Imambara) পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অবস্থিত সপ্তদশ শতাব্দীর এক সুপরিচিত ঐতিহাসিক ও পবিত্র শিয়া ইমামবাড়া। ১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল শাসনামলে নির্মিত এই বিশাল ধবল ইমারতটি কারবালার প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর শাহাদাতকে স্মরণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সাদা মার্বেল পাথর, সুউচ্চ গম্বুজ, সুদৃশ্য খিলান এবং সামনের বিশাল দিঘির প্রতিফলন সংবলিত এই ইমারতটি ঢাকার অন্যতম প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী স্থান। ১. ইতিহাস ও ঐতিহ্য মুঘল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে এবং সুবাদার শাহ শুজার শাসনামলে ১৬৪২ সালে তাঁর নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ এই ঐতিহ্যবাহী হোসেনী দালান নির্মাণ করেন। কথিত আছে, মীর মুরাদ স্বপ্নে হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর নির্দেশে একটি তাম্বুখানা নির্মাণ করেন, যা পরবর্তীতে বিশালাকার ইমামবাড়ার রূপ নেয়। ১৮৯৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঢাকার নওয়াব আহসানউল্লাহ বাহাদুর বিপুল অর্থ ব্যয় করে এটিকে বর্তমান ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্যের মেলবন্ধনে পুনর্নির্মাণ করেন। প্রতি বছর পবিত্র মহররম মাসের ১০ তারিখে (আশুরা) এখান থেকেই তাজিয়া মিছিল বের হয়। ২. কোথায় অবস্থিত হোসেনী দালানটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পুরান ঢাকার বকশীবাজার এলাকায় (চাঁনখারপুল ও নাজিমুদ্দিন রোডের খুব কাছে) অবস্থিত। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কার্জন হল থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। ৩. কেন ভ্রমণ করবেন মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্য: ধবধবে সাদা বিশাল ইমারত, উঁচু খিলান এবং সামনের পুকুরে সুরম্য প্রাসাদের ছায়ার নয়নাভিরাম দৃশ্য। ঐতিহাসিক তাজিয়া কেন্দ্র: আশুরার ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া ও রুপার তৈরি ঐতিহাসিক অলংকারের অনন্য স্থান। শান্ত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ: পুরান ঢাকার ব্যস্ততার মাঝে এক টুকরো শান্ত, স্নিগ্ধ ও পবিত্র জলাশয় পরিবেষ্টিত প্রাঙ্গণ। সহজ যাতায়াত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চাঁনখারপুল সংলগ্ন হওয়ায় খুব সহজেই ঘুরে দেখা যায়। ৪. কীভাবে যাবেন ধাপ ১: ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে চাঁনখারপুল বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি বা মতিঝিল থেকে বাসে চড়ে চাঁনখারপুল মোড়ে নামা যায়। অথবা মেট্রোরেলে করে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়' স্টেশনে নেমে সহজেই এই এলাকায় চলে আসা যায়। ধাপ ২: চাঁনখারপুল থেকে হোসেনী দালান চাঁনখারপুল মোড় বা বকশীবাজার মোড় থেকে ঐতিহ্যবাহী রিকশায় চড়ে মাত্র ৫-১০ মিনিটে হোসেনী দালান রোডের মূল ফটকে পৌঁছানো যায় (রিকশা ভাড়া ৩০ - ৫০ টাকা)। ৫. ভ্রমণের সময়সীমা হোসেনী দালানের মূল ইমারত, জলাশয় ও এর প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখতে ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় লাগে। এর সাথে লালবাগ কেল্লা বা নাজিরাবাজার ঘুরে দেখতে পুরো একদিনের ট্যুর দেওয়া যায়। ৬. সম্ভাব্য খরচ ও বাজেট খাত বিবরণ আনুমানিক খরচ (জনপ্রতি) যাতায়াত (ঢাকা শহরের ভেতরে) মেট্রোরেল / বাস ও রিকশা ভাড়া ৳৮০ - ৳১৫০ খাবার (নাজিরাবাজার ফুড স্ট্রিট) হাজীর বিরিয়ানি, কাবাব ও বিউটি লস্যি ৳২০০ - ৳৪০০ প্রবেশ ফি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত ৳০ সর্বমোট সম্ভাব্য বাজেট ৳২৮০ - ৳৫৫০ ৭. গাইড ও নিরাপত্তা অনুমতি হোসেনী দালান দেখার জন্য কোনো অনুমতি বা টিকেট লাগে না। প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মীরা সহায়তা করেন। সাধারণ দর্শনার্থীরা নিঃসংকোচে এটি ঘুরে দেখতে পারেন। ৮. কোথায় থাকবেন এটি ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় আলাদা আবাসনের প্রয়োজন হয় না। বাইরের জেলা থেকে আসা দর্শনার্থীরা গুলিস্তান, মতিঝিল বা ধানমন্ডি এলাকার ভালোমানের হোটেলে থাকতে পারেন। ৯. কী খাবেন হোসেনী দালানের কাছেই বিখ্যাত 'নাজিরাবাজার খাবারের গলি'। সেখানে আল-ইসলামিয়া বা হাজীর বিরিয়ানি, নান্নার মোরগ পোলাও, বিউটি লস্যি ও মাঠা এবং বাকরখানি আস্বাদন করতে পারেন। ১০. কী কী সঙ্গে নেবেন শালীন ও মার্জিত পোশাক (ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান জানাতে)। ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা বা স্মার্টফোন। পায়ে সহজে খোলা যায় এমন জুতো (ইমামবাড়ার মূল হলে প্রবেশের সময় জুতো খুলতে হয়)। ১১. কঠিনতার মাত্রা ও নিরাপত্তা সতর্কতা ধর্মীয় স্থান ও পরিদর্শনের নিয়মাবলী: শালীনতা রক্ষা: এটি একটি পবিত্র ধর্মীয় স্থান, তাই মার্জিত পোশাক পরুন এবং প্রাঙ্গণে নীরবতা বজায় রাখুন। মহররমের সময় ভিড়: মহররমের ১০ তারিখে অতিরিক্ত ভিড় ও তাজিয়া মিছিল থাকে, তাই সাধারণ দর্শনে আসার জন্য অন্যান্য দিন বেছে নেওয়া ভালো। পরিচ্ছন্নতা রাখুন: পুকুরে বা চত্বরে আবর্জনা ফেলবেন না। ১২. ভ্রমণের সেরা সময় শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) পুরান ঢাকা হেঁটে ঘুরে দেখার জন্য আদর্শ। তবে আশুরার ঐতিহ্যবাহী আয়োজন দেখতে চাইলে মহররম মাসে আসা যেতে পারে। ১৩. সম্পূর্ণ ভ্রমণ পরিকল্পনা (১ দিনের আদর্শ ইটিনারারি) সকাল ১০:০০ AM: ঢাকা কার্জন হল ঘুরে ঐতিহাসিক হোসেনী দালানে আগমন। সকাল ১০:৩০ AM: হোসেনী দালানের প্রাসাদ, পুকুর পাড় ও স্থাপত্য কারুকাজ দর্শন। দুপুর ১২:৩০ PM: রিকশায় লালবাগ কেল্লায় গমনাগমন ও দুর্গ চত্বর ভ্রমণ। দুপুর ০২:০০ PM: নাজিরাবাজারে বিখ্যাত হাজীর বিরিয়ানি ও মাঠা দিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়া। বিকাল ০৩:৩০ PM: তারা মসজিদ ও আরমেনিয়ান চার্চ ঘুরে দেখা। ১৪. আশেপাশের দর্শনীয় স্থান লালবাগ কেল্লা: ১৭ শতকের বিখ্যাত মুঘল দুর্গ ও পরীবিবির মাজার (মাত্র ১.৫ কিমি দূরে)। কার্জন হল (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়): ব্রিটিশ ও মুঘল স্থাপত্যের অপূর্ব লাল ইটের ঐতিহাসিক ভবন। তারা মসজিদ: নীল তারার চিনিতুকড়ি নকশায় সজ্জিত অনন্য তারা মসজিদ। নাজিরাবাজার: পুরান ঢাকার বিশ্বখ্যাত স্ট্রিট ফুড হাব। ১৫. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ) প্রশ্ন: হোসেনী দালান কে কত সালে নির্মাণ করেন? উত্তর: ১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সুবাদার শাহ শুজার আমলে তাঁর নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ এটি নির্মাণ করেন। প্রশ্ন: হোসেনী দালানে প্রবেশের জন্য কি টিকেট লাগে? উত্তর: না, হোসেনী দালানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট বা ফি লাগে না। এটি দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত। প্রশ্ন: অমুসলিম দর্শনার্থীরা কি হোসেনী দালানে যেতে পারেন? উত্তর: হ্যাঁ, সকল ধর্মের পর্যটকরা শালীন পোশাক পরিধান করে স্থানটি পরিদর্শনের অনুমতি পান। প্রশ্ন: হোসেনী দালান কোথায় অবস্থিত? উত্তর: এটি পুরান ঢাকার বকশীবাজার এলাকায় (চাঁনখারপুল মোড়ের কাছে) অবস্থিত।

ভ্রমণের সেরা সময়

শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) পুরান ঢাকা হেঁটে ঘুরে দেখার জন্য আদর্শ। তবে আশুরার ঐতিহ্যবাহী আয়োজন দেখতে চাইলে মহররম মাসে আসা যেতে পারে।